গণমানুষের অধিকার ও বিদ্যুৎ বিপ্লবের অগ্রদূত: স্যার মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহর জীবনগাথা

ভেলোর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা: স্যার মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহর এক গৌরবময় প্রশাসনিক মহাকাব্য

আমি স্যার মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ। ১৮৬৯ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর মাদ্রাজের এক রাজকীয় পরিবেশে আমার জন্ম। আমি আরকট রাজপরিবারের একজন সদস্য এবং আরকটের নবাবদের সাথে আমার ছিল রক্তের সম্পর্ক। শৈশব থেকেই আমি স্বপ্ন দেখতাম দেশ ও মানুষের জন্য গঠনমূলক কিছু করার। আজ আপনাদের শোনাব একজন আইনজীবী থেকে ট্রাভাঙ্কোরের দেওয়ান হওয়ার সেই দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য যাত্রার কথা।

চিত্র: খান বাহাদুর স্যার মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ (১৮৬৯ - ১৯৪৮)

আইন পেশা ও রাজনীতির হাতেখড়ি

আমার উচ্চশিক্ষার পাঠ শুরু হয়েছিল সাইদাপেটের জিলা হাই স্কুলে, যেখানে আমি আইন নিয়ে পড়াশোনা করি। ১৮৮৮ সালের জুলাই মাসে আমি ভেলোরের বারে আইনজীবী হিসেবে যোগদান করি। তবে কেবল আদালত কক্ষের চার দেয়ালের মাঝে আমি সীমাবদ্ধ থাকতে চাইনি। ১৮৯৫ সালে আমি ভেলোর পৌরসভার সম্মানিত চেয়ারম্যান নির্বাচিত হই। জনসেবার নেশায় ১৯০১ সালে আমি আমার আইনি পেশা থেকে ইস্তফা দিই এবং দীর্ঘ ১৪ বছর ভেলোর পৌরসভার উন্নতির জন্য কাজ করি।


এক নজরে আমার জীবন ও অর্জন

বিবরণ তথ্য
জন্ম ২২ সেপ্টেম্বর ১৮৬৯ (মাদ্রাজ)
পেশা আইনজীবী, প্রশাসক ও রাজনীতিবিদ
গুরুত্বপূর্ণ পদ ট্রাভাঙ্কোরের দেওয়ান (১৯৩৪-১৯৩৬)
সম্মাননা নাইটহুড (KCSI, KCIE), খান বাহাদুর
মৃত্যু ১৬ মে ১৯৪৮ (মাদ্রাজ)

আন্তর্জাতিক মঞ্চ ও ভাইসরয়ের পরিষদ

আমার কাজের ক্ষেত্র কেবল ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯১৯ সালে আমি লীগ অফ নেশনসের প্রথম অধিবেশনে ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেওয়ার গৌরব অর্জন করি। এরপর ১৯২০ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত আমি মাদ্রাজের গভর্নরের কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। ১৯২৫ থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত আমি ভারতের ভাইসরয়ের নির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলাম এবং ১৯২৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলাম।

"প্রকৃত প্রশাসন সেটাই, যা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করে।"

ট্রাভাঙ্কোরের দেওয়ান ও আধুনিক সংস্কার

১৯৩৪ সালে আমি ট্রাভাঙ্কোরের মহারাজা চিত্রিরা থিরুনাল বলরাম বর্মার অধীনে দেওয়ান নিযুক্ত হই। এই দুই বছরে আমি ট্রাভাঙ্কোরে অনেক যুগান্তকারী সংস্কার করি। আমি নির্বাচনী ব্যবস্থায় খ্রিস্টান, এজাভাস এবং মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করি। এছাড়াও ১৯৩৫ সালে বর্ণ বা ধর্মীয় বৈষম্য ছাড়াই সিভিল সার্ভিসে নিয়োগের জন্য 'পাবলিক সার্ভিস কমিশনার' পদটি তৈরি করি। আমার অন্যতম বড় সাফল্য ছিল 'পল্লীবাসাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প' তৈরি করা, যা ট্রাভাঙ্কোরে বৃহৎ পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিপ্লব ঘটিয়েছিল।

জীবন সায়াহ্ন ও উত্তরসূরি

১৯৩৬ সালে আমি দেওয়ানের দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণ করি। আমার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার আমাকে 'খান বাহাদুর', 'নাইট ব্যাচেলর', এবং পরবর্তীতে 'স্টার অফ ইন্ডিয়ার নাইট কমান্ডার' (KCSI) উপাধিতে ভূষিত করে। আজ চেন্নাইয়ের টি নগরে আমার নামে যে 'হাবিবুল্লাহ রোড' রয়েছে, তা আমাকে প্রতিনিয়ত মানুষের ভালোবাসার কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯৪৮ সালের ১৬ মে মাদ্রাজে আমার এই নশ্বর জীবনের অবসান ঘটে।

Comments

Popular posts from this blog

আইনতত্ত্বের কারিগর ও দিল্লির স্পিকার: আমি বিচারপতি স্যার আবদুর রহিম

গণিতজ্ঞ থেকে আলিগড়ের প্রাণপুরুষ: স্যার জিয়াউদ্দিন আহমদের এক মহিমান্বিত আত্মকথা