আইনতত্ত্বের কারিগর ও দিল্লির স্পিকার: আমি বিচারপতি স্যার আবদুর রহিম

বিচারপতি থেকে আইনসভার কাণ্ডারি: স্যার আবদুর রহিমের এক মহাকাব্যিক আত্মকথা

আমি স্যার আবদুর রহিম। ১৮৬৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলার মেদিনীপুরের এক ঐতিহ্যবাহী জমিদার পরিবারে আমার জন্ম। আমার পিতা মৌলভি আবদুর রব ছিলেন এক নিষ্ঠাবান জমিদার। মেদিনীপুরের সেই শান্ত পরিবেশ থেকে শুরু করে দিল্লির কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের স্পিকার হওয়ার যাত্রাপথটি ছিল দীর্ঘ এবং চ্যালেঞ্জিং। আজ আপনাদের শোনাব আমার সেই জীবন সংগ্ৰামের গল্প।

স্যার আবদুর রহিম

চিত্র: স্যার আবদুর রহিম (১৮৬৭ - ১৯৫২)

শিক্ষা ও আইনের জগতে পদার্পণ

আমার উচ্চশিক্ষার হাতেখড়ি হয় কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজে। এরপর আইনের উচ্চতর পাঠ নিতে আমি লন্ডনের মিডল টেম্পলে ভর্তি হই। ১৮৯০ সালে দেশে ফিরে আমি কলকাতা হাইকোর্টে ব্যারিস্টার হিসেবে আমার পেশাজীবন শুরু করি। আইনের সূক্ষ্ম বিচার বিশ্লেষণ আমাকে সব সময় টানত, যার ফলস্বরূপ ১৯০৮ সালে আমি মাদ্রাজ হাইকোর্টের বিচারক নিযুক্ত হই।


এক নজরে আমার জীবন ও অর্জন

বিবরণ তথ্য
জন্ম সেপ্টেম্বর ১৮৬৭ (মেদিনীপুর, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি)
পেশা আইনজীবী, বিচারক ও রাজনীতিবিদ
বিখ্যাত বই দ্য প্রিন্সিপলস অব মোহামেডান জুরিস্প্রুডেন্স
রাজনৈতিক পদ কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের স্পিকার (১৯৩৫-১৯৪৫)
জীবনাবসান ১৯৫২ সাল

আইনতত্ত্ব ও সামাজিক অবদান

বিচারক থাকাকালীন আমি অনুভব করেছিলাম যে মুসলিম আইনের মূল নীতিগুলো আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার দেওয়া ধারাবাহিক বক্তব্যগুলো পরবর্তীতে 'দ্য প্রিন্সিপলস অব মোহামেডান জুরিস্প্রুডেন্স' নামে প্রকাশিত হয়, যা আজও আইনের শিক্ষার্থীদের কাছে একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ। শুধু আইন নয়, শিক্ষার প্রসারেও আমি সচেষ্ট ছিলাম। মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য এবং মৌলানা আজাদ কলেজ প্রতিষ্ঠায় আমার সক্রিয় ভূমিকা ছিল।

"আমি বিশ্বাস করি, একটি জাতির প্রকৃত মুক্তি নির্ভর করে তার শিক্ষা এবং শক্তিশালী আইনি কাঠামোর ওপর।"

রাজনীতি ও নেতৃত্বের দিনগুলো

১৯২১ থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত আমি বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির বিচারবিভাগের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। রাজনীতির মাঠে আমি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলাম। ১৯২৯ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত আমি নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করি। আমার জীবনের অন্যতম বড় অর্জন ছিল ১৯৩৫ সালে কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের স্পিকার নির্বাচিত হওয়া। টানা ১০ বছর আমি এই মর্যাদাশীল পদে আসীন ছিলাম এবং অত্যন্ত নিরপেক্ষতার সাথে আইনসভা পরিচালনা করার চেষ্টা করেছি।

একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি ও বিদায়

অনেকেই হয়তো জানেন না যে, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আমার জামাতা ছিলেন; আমার মেয়ে বেগম নিয়াজ ফাতেমা তাঁর স্ত্রী। জীবনের শেষ পর্যায়ে ১৯৪৬ সালে আমি আমার সংগৃহীত ৩৩৩টি মূল্যবান আরবি ধর্মীয় গ্রন্থ ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরিকে দান করে দিই, যা আজও 'স্যার আবদুর রহিম সংগ্রহ' নামে পরিচিত। ১৯৫২ সালে ৮৫ বছর বয়সে আমার এই নশ্বর জীবনের অবসান ঘটে।

Comments

Popular posts from this blog

গণিতজ্ঞ থেকে আলিগড়ের প্রাণপুরুষ: স্যার জিয়াউদ্দিন আহমদের এক মহিমান্বিত আত্মকথা