আমি বদরুদ্দীন তৈয়বজী: এক ঐতিহাসিক যাত্রার গল্প

জাতীয় ঐক্যের রূপকার ও প্রথম মুসলিম কংগ্রেস সভাপতি: ব্যারিস্টার বদরুদ্দীন তৈয়বজীর আত্মকথা

আমি বদরুদ্দীন তৈয়বজী। আজ জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে যখন অতীতে ফিরে তাকাই, আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে উনিশ শতকের সেই উত্তাল ভারতবর্ষ। ১৮৪৪ সালের ১০ই অক্টোবর বোম্বাইয়ের এক সম্ভ্রান্ত সুলাইমানি বোহরা মুসলিম পরিবারে আমার জন্ম। আমার পিতা মোল্লা তায়াব আলি ভাই মিয়াঁ ছিলেন একজন দূরদর্শী মানুষ, যিনি চেয়েছিলেন তাঁর সন্তানরা যেন দেশ ও দশের সেবায় শিক্ষিত হয়ে ওঠে।

বদরুদ্দীন তৈয়বজী
বদরুদ্দীন তৈয়বজী: একজন আধুনিক মুসলিম ও মহান দেশপ্রেমিক

বিলেত যাত্রা ও ব্যারিস্টারি শিক্ষা

আমার শৈশবের পড়াশোনা শুরু হয়েছিল 'দাদা মাখরা মাদ্রাসা' থেকে, যেখানে আমি ফারসি ও উর্দুর প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করি। এরপর বোম্বাইয়ের এলফিনস্টোন ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হই। তবে আমার স্বপ্ন ছিল আরও বিশাল। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বড় ভাইয়ের হাত ধরে আমি লন্ডনের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাই। সেখানে নিউবারি হাইপার্ক কলেজে পড়াশোনা শুরু করি।

১৮৬৩ সালে আমি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় ও মিডল টেম্পলে আইন বিভাগে ভর্তি হই। মাঝপথে চোখের সমস্যায় আমাকে একবার দেশে ফিরতে হলেও আমার সংকল্প ছিল অটুট। পড়াশোনা শেষ করে আমি যখন দেশে ফিরি, তখন আমি ছিলাম বোম্বাই হাইকোর্টে ব্যারিস্টারি করা প্রথম ভারতীয়


এক নজরে আমার জীবন কাহিনী

বিষয় বিবরণ
জন্ম ১০ই অক্টোবর, ১৮৪৪ (বোম্বাই প্রেসিডেন্সি)
পেশা আইনজীবী, সমাজকর্মী ও রাজনীতিবিদ
কংগ্রেসের ভূমিকা তৃতীয় সভাপতি ও প্রথম মুসলিম সভাপতি (১৮৮৭)
বিচারপতি বোম্বাই হাইকোর্টের প্রথম ভারতীয় প্রধান বিচারপতি (ভারপ্রাপ্ত)
জীবনাবসান ১৯শে আগস্ট, ১৯০৬ (লন্ডন)

রাজনীতি ও হিন্দু-মুসলিম ঐক্য

আমার বড় ভাই কাম্রুমদ্দিনের হাত ধরেই রাজনীতির সাথে আমার পরিচয়। আমি বিশ্বাস করতাম, ভারতের স্বাধীনতার জন্য হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে গভীর ঐক্য প্রয়োজন। ১৮৮৭ সালে আমি যখন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের তৃতীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করি, তখন অনেক মুসলিম নেতা কংগ্রেসের বিরোধিতা করেছিলেন। এমনকি স্যার সৈয়দ আহমদ খান আমাকে চিঠি লিখে তাঁর উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু আমি সব সময় বিশ্বাস করেছি যে, কংগ্রেস এমন একটি মঞ্চ যেখানে প্রতিটি ভারতীয়র স্বার্থ সুরক্ষিত।

"আমি বিশ্বাস করি, ভারতের হিন্দু ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষা করতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এক অনন্য প্ল্যাটফর্ম এবং আমাদের সবার মিলিত প্রচেষ্টাই ভারতের উন্নতি বয়ে আনবে।"

সমাজ সংস্কার ও শেষ দিনগুলো

আমি ছিলাম আধুনিক চিন্তার মানুষ। আমি বিশ্বাস করতাম, নারীকে অশিক্ষিত রেখে সমাজ এগোতে পারে না। তাই নিজের পরিবার থেকেই আমি সমাজ সংস্কারের কাজ শুরু করি। আমার কন্যাদের উচ্চশিক্ষার জন্য আমি লন্ডনে পাঠিয়েছিলাম। ১৮৯৫ সালে আমি বোম্বাই হাইকোর্টের বিচারপতি হই এবং পরবর্তীতে প্রথম ভারতীয় হিসেবে সেখানে প্রধান বিচারপতি হওয়ার বিরল সম্মান অর্জন করি।

১৯০৬ সালের ১৯শে আগস্ট লন্ডনে থাকাকালীন আকস্মিক এক হৃদরোগে আমার জীবন প্রদীপ নিভে যায়। তবে আমার স্বপ্ন ছিল একটি শিক্ষিত ও ঐক্যবদ্ধ ভারত, যা আজও প্রতিটি দেশপ্রেমিকের হৃদয়ে জাগ্রত আছে।

Comments

Popular posts from this blog

আইনতত্ত্বের কারিগর ও দিল্লির স্পিকার: আমি বিচারপতি স্যার আবদুর রহিম

গণিতজ্ঞ থেকে আলিগড়ের প্রাণপুরুষ: স্যার জিয়াউদ্দিন আহমদের এক মহিমান্বিত আত্মকথা