রাজপ্রাসাদ থেকে জনগণের দরবারে: স্যার রফিউদ্দিন আহমেদের এক বর্ণাঢ্য জীবনকাহিনী

রাজকীয় পরামর্শক ও জনসেবক: স্যার রফিউদ্দিন আহমেদের আত্মকথা

আমি স্যার রফিউদ্দিন আহমেদ। পরিচিত মহলে আমাকে সবাই 'মৌলভী' নামেই চিনতেন। ১৮৬৫ সালে পুনের পবিত্র মাটিতে আমার জন্ম। আজ যখন পেছনের দিকে ফিরে তাকাই, আমার মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা যখন ভারত ও ইংল্যান্ডের রাজকীয় মহলের মধ্যে আমি এক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেছিলাম। আমার জীবন ছিল আইন, সাংবাদিকতা আর রাজনীতির এক রোমাঞ্চকর সংমিশ্রণ।

রফিউদ্দিন আহমেদ
বদরুদ্দীন তৈয়বজী: একজন আধুনিক মুসলিম ও মহান দেশপ্রেমিক

শিক্ষা ও বিলেতের দিনগুলো

আমার উচ্চশিক্ষার হাতেখড়ি হয়েছিল পুনের ডেকান কলেজে। কিন্তু জ্ঞানের তৃষ্ণা আমাকে নিয়ে গিয়েছিল সুদূর লন্ডনের কিংস কলেজে। ১৮৯২ সালে মিডল টেম্পল থেকে আমি ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল ডিগ্রি অর্জন করি। সেই সময় লন্ডনে থাকা প্রতিটি দিন ছিল আমার জন্য নতুন কিছু শেখার সুযোগ। আমি শুধু আইন শিখিনি, শিখেছি কীভাবে একটি পরাধীন জাতির প্রতিনিধি হয়ে বিদেশের মাটিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়।


এক নজরে আমার পরিচয়

বিবরণ তথ্য
জন্ম ১৮৬৫ সাল (পুনে, ভারত)
উপাধি স্যার (নাইটহুড, ১৯৩২), মৌলভী
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ডেকান কলেজ, কিংস কলেজ লন্ডন, মিডল টেম্পল
রাজনৈতিক পদ কৃষিমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী (১৯২৮-১৯৩৪)
মৃত্যু ১৯৫৪ সাল (পুনে)

রানী ভিক্টোরিয়া ও কূটনৈতিক মিশন

লন্ডনে থাকাকালীন আমার জীবনের এক অনন্য অধ্যায় শুরু হয়। রানী ভিক্টোরিয়ার অত্যন্ত বিশ্বস্ত ভারতীয় সচিব আব্দুল করিম (যিনি মুন্সি নামে পরিচিত ছিলেন) ছিলেন আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাঁর মাধ্যমেই আমি রানীর অত্যন্ত প্রিয়ভাজন হয়ে উঠি। রানী ভিক্টোরিয়া আমাকে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে, ১৮৯০-এর দশকে অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের কাছে কূটনৈতিক মিশনে আমাকে নিয়োজিত করার ক্ষেত্রে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। যদিও রানীর ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ব্রিটিশ দূতাবাসে আমার নিয়োগ শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি, তবুও সেই রাজকীয় সান্নিধ্য আমার জীবনের এক অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে।

"আমি সবসময় চেয়েছি আমার শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা যেন আমার দেশের মানুষের কল্যাণে লাগে।"

ভারতের রাজনীতি ও জনসেবা

দেশে ফিরে আমি নিজেকে রাজনীতির সাথে জড়িয়ে ফেলি। আমি মুসলিম প্যাট্রিয়টিক লীগের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলাম। মন্ট্যাগু-চেমসফোর্ড সংস্কারের অধীনে আমি বোম্বাই প্রেসিডেন্সির কাউন্সিলে নির্বাচিত হই। ১৯২৮ সালে আমি কৃষিমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়ে আমি সাধারণ মানুষের শিক্ষার প্রসারে কাজ করার চেষ্টা করেছি। সরকারে আমার এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৩২ সালে আমাকে 'নাইট' উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

শেষ জীবন

জীবনের শেষ ২০টি বছর আমি আমার জন্মস্থান পুনেতেই কাটিয়েছি। ১৯৫৪ সালে ৮৮ বছর বয়সে আমার জীবনাবসান ঘটে। আমি বিশ্বাস করি, দেশপ্রেম কেবল স্লোগানে নয়, বরং শিক্ষা এবং সঠিক কূটনৈতিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধিতেই প্রকৃত সার্থকতা।

Comments